সোমবার, ১৪ Jun ২০২১, ০৩:৩৬ অপরাহ্ন

শিরোনাম:

Welcome To Our Website...

বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের দুর্দশা উঠে এলো ব্রিটিশ

বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের দুর্দশা উঠে এলো ব্রিটিশ

যুক্তরাজ্য এবং নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে ফ্যাশন আউটলেটগুলো যখন আবার খোলা হচ্ছে, তখন বিশ্বের আরেক প্রান্তে যারা ওই সব পোশাক সেলাই করেন তারাই না খেয়ে থাকছেন এবং কাজ হারাচ্ছেন।

বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের দুর্দশা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্যা গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে রাজধানী ঢাকার ২৬ বছরের একজন পোশাক শ্রমিক নাজমিন নাহারের কথা বলা হয়েছে। ধার করা চালের ওপর ভরসা করেই জীবনধারণ করতে হচ্ছে দুই সন্তানের মা নাজমিনকে। দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে খাবার বা ভাড়া দেওয়ার মতো মজুরি তার হাতে নেই। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা সত্ত্বেও ম্যাগপাই নিটওয়্যারের সঙ্গে কাজ করে খুশি ছিলেন নাজমিন। সেখান থেকে তিনি মাসে ১৫০ পাউন্ড (১৫ হাজার ৭২৮ টাকা) উপার্জন করতেন। এই ম্যাগপাই নিটওয়্যার বার্টন এবং এইচএন্ডএম-এর মতো ব্রিটিশ ব্র্যান্ডগুলোর জন্য পোশাক তৈরি করে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) বলছে, কয়েক বিলিয়ন ডলারের অর্ডার বাতিল হওয়ায় শ্রমিক ছাঁটাই করতে বাধ্য হচ্ছেন গার্মেন্টস মালিকেরা। শ্রমিক অধিকারের সুরক্ষায় কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে পাশ্চাত্যের ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর এই ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে।

মার্চে করোনা মহামারির ব্যাপক প্রাদুর্ভাবের সময় বিভিন্ন দেশ লকডাউনে চলে যায়। ফলে ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো বিশ্বব্যাপী তাদের সরবরাহকারীদের কয়েক মিলিয়ন ডলারের পোশাকের অর্ডার বাতিল করে দেয়। বাতিলের তালিকায় ইতিমধ্যেই প্যাকেটজাত হয়ে শিপিং-এর জন্য অপেক্ষমাণ পোশাকও রয়েছে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)-এ বলছে, ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো সরবরাহকারীদের কাছে ইতিমধ্যেই তাদের দেওয়া প্রায় তিন বিলিয়ন ডলারের অর্ডার প্রত্যাহার করেছে।

বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক জানিয়েছেন, গত মাসে ২৫ হাজারেরও বেশি শ্রমিক চাকরি হারিয়েছে। তার আশঙ্কা, বিদেশিদের অর্ডার না পেলে আগামী ছয় মাসে বেকার শ্রমিকের সংখ্যা পাঁচ লাখে পৌঁছাতে পারে।

মার্চের শেষদিকে বাংলাদেশ লকডাউনে যায় এবং কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। গত ৪ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটি ফের চালু হলেও নাজমিনকে না করে দেওয়া হয়। দ্য গার্ডিয়ানকে নাজমিন বলেন, ‘তারা আমাদের বলেছে, বিদেশি ক্রেতারা সব অর্ডার বাতিল করে দিচ্ছে। ফলে কোনও নতুন কাজ নেই। দুই মাস ধরে আমাদের কোনো বেতন নেই।’

নাজমিন নাহার বলেন, ‘আমাদের বাসা ভাড়া বকেয়া পড়ে আছে। যাবতীয় মুদি সামগ্রী আমরা বাকিতে কিনে থাকি। এখন আগের টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত তারা আমাদের আর কোনও খাবার দেবে না। বাড়িওয়ালা আমাদের জন্য এক বস্তা চালের ব্যবস্থা করতে পেরেছেন এবং তাতেই আমরা বেঁচে আছি।’

ম্যাগপাই নিটওয়্যারের অর্ডারকারী এইচঅ্যান্ডএম-এর দাবি, তারা ওই গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের কোনও অর্ডার বাতিল করেনি। প্রতিষ্ঠানটির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘আমাদের কাছে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত সব শ্রমিককে আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে।’

মাতালানসহ অন্যান্য পশ্চিমা ব্র্যান্ডের জন্য পোশাক সামগ্রী তৈরি করে আল্টিমেট ফ্যাশন লিমিটেড। ঢাকা থেকে এক ঘণ্টা দূরের এ প্রতিষ্ঠানটির কারখানায় কাজ করতেন রোজিনা বেগম। ঘরে আট বছরের পুত্র সন্তানের সঙ্গে খেলছিলেন রোজিনা। তিনি জানান, করোনাভাইরাসের ধাক্কায় কারখানার আরও ৩০০ জন কর্মীসহ তিনি চাকরিচ্যুত হন। সেখানে তার মাসিক বেতন ছিল আট হাজার টাকা।

ট্রেড ইউনিয়ন রোজিনাকে জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তাদের বলেছে, বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্ডার বাতিলের ফলে তাদের এই ছাঁটাইয়ে যেতে হয়েছে।

রোজিনা বলেন, ‘করোনাভাইরাসের ভয় না থাকলে আমরা তীব্র প্রতিবাদ করতে পারতাম। তবে এ ভাইরাসের কারণে আমরা শ্রমিকদের জড়ো করে জোরালো প্রতিবাদ জানাতে পারিনি। যখনই চার-পাঁচজন শ্রমিক কারখানার সামনে জড়ো হয়েছে, তখনই তারা আমাদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে। আপনি তো আর একাই জোরালো প্রতিবাদ গড়ে তুলতে পারবেন না।’

আঁখি আক্তার নামের আরেক শ্রমিক স্টার্লিং স্টাইলস নামের একটি  কারখানায় ৯ হাজার ৩০০ টাকা মাসিক বেতনে কাজ করতেন। তিনি জানান, কোভিডের লক্ষণ নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এখন অন্য কোনও চাকরি পাওয়াও তার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অথচ আগের  প্রতিষ্ঠানে তার এখনও দুই মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে।

আঁখি আক্তার বলেন, ‘আমরা গ্রামেও ফিরে যেতে পারছি না। কারণ যেখানে আমাদের কিছুই নেই, সেখানে আমরা কী করব? আমি মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছি। কাজই আমাদের উপার্জনের একমাত্র উৎস।’ তিনি বলেন,  অর্ডার সংকুচিত হয়ে এসেছে। কারখানাগুলো শ্রমিকদের ছাঁটাই করছে।

বাংলাদেশে যদিও কারখানাগুলো এখন ফের চালু হচ্ছে, তবে অর্ডারের পরিমাণ আগের চেয়ে প্রায় ৮০ ভাগ কম। ওয়ার্কার্স রাইটস কনসোর্টিয়াম কর্তৃক চালু করা একটি অনলাইন ট্র্যাকারের তথ্য অনুযায়ী, আর্কাডিয়া, প্রাইমার্ক, এডিনবার্গ উলেন মিলসহ ব্রিটিশ খুচরা ব্র্যান্ডগুলো তাদের সব অর্ডারের জন্য  বিদেশি সরবরাহকারীদের পুরো অর্থ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেয়নি।

আল্টিমেট ফ্যাশন-এর একজন মুখপাত্র বলেন, ‘কোভিড এবং সামাজিক দূরত্বের কারণে আমাদের ৭০ ভাগ শ্রমিক ও সক্ষমতা নিয়ে উৎপাদন পরিকল্পনা করতে হয়েছিল। এ জন্য সরকারি নিয়ম ও প্রবিধান মেনে আমাদের কিছু শ্রমিককে ছাড়তে হয়েছিল।’ আর্কাডিয়া, ম্যাগপাই নিটওয়্যার এবং স্টার্লিং স্টাইলস-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে অবশ্য এ ব্যাপারে কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

ক্যাম্পেইনাররা বলছেন, এখন যেহেতু দোকানগুলো ফের চালু হয়েছে, ব্র্যান্ডগুলোরও জন্য তাই তাদের সরবরাহকারীদের প্রতি আর্থিক দায়বদ্ধতার বিষয়টির প্রতি সম্মান জানানো গুরুত্বপূর্ণ।

ক্লিন ক্লথস ক্যাম্পেইনের ক্যাম্পেইনার মেগ লুইস বলেন, ‘আমরা সবাই গত সপ্তাহে ফ্যাশন স্টোরগুলোর বাইরে সারিবদ্ধ মানুষের ছবি দেখেছি। কিন্তু এই একই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মীদের সবচেয়ে প্রয়োজনের সময়টিতেই তাদের পরিত্যাগ করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মহামারিতে নিজেদের আচরণের জন্য ব্র্যান্ডগুলোকে জবাবদিহিতা করতে হয়নি। একটি কারখানাকে দেওয়া অর্ডারের জন্য অর্থ পরিশোধ করা কোনও দাতব্য কাজ নয়। লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকার বিনিময়ে তারা নিজেদের মুনাফার সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে।’

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অ্যাপারেল জায়ান্ট গ্যাপ-এর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ‘আমরা আমাদের বিক্রেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যোগাযোগ করেছি। কয়েক সপ্তাহ ধরে আমাদের অর্ডারগুলো মূল্যায়নের জন্য তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করেছি। সামনের মাসগুলোর জন্য পরিকল্পনা হাজির করেছি।’ আরেক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান মাতালান-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘আমরা সেই পণ্যগুলো বিক্রিতে সমর্থ না হওয়া সত্ত্বেও ইতোমধ্যেই ট্রানজিটে থাকা অর্ডারগুলোর প্রতি সম্মান জানাচ্ছি। অর্ডার বাতিল এড়াতে যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

সূত্রঃ আমাদের সময়

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2019

Design BY POPULARHOSTBD